উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ইতিহাসে চিলাহাটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী নাম। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন এবং এর সীমান্ত ট্রানজিট রুটের রয়েছে এক গৌরবময় ও ঘটনাবহুল অতীত।
উপমহাদেশের রেল যোগাযোগের ইতিহাসে চিলাহাটি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী নাম। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশন এবং এর সীমান্ত ট্রানজিট রুটের রয়েছে এক গৌরবময় ও ঘটনাবহুল অতীত।
১. ব্রিটিশ আমল ও রেললাইনের গোড়াপত্তন (১৮৭৮ - ১৯৪৭)
উপমহাদেশে রেল যোগাযোগের সোনালী সময়ে ব্রিটিশরা উত্তরবঙ্গ ও আসামের সাথে কলকাতার সরাসরি যোগাযোগের জন্য বিশাল রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।
- নির্মাণ ও রুট: ১৮৭৮ সালে ‘নর্থ বেঙ্গল স্টেট রেলওয়ে’ কর্তৃক চিলাহাটি ও এর আশেপাশের রেললাইন স্থাপন করা হয়। সে সময় কলকাতা (শিয়ালদহ) থেকে শিলিগুড়ি যাওয়ার মূল ব্রডগেজ রুটটি বর্তমান বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পরিচালিত হতো। ট্রেনগুলো কলকাতার শিয়ালদহ থেকে ছেড়ে ভেড়ামারা, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ, ঈশ্বরদী, সান্তাহার, পার্বতীপুর, নীলফামারী হয়ে চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ি হয়ে শিলিগুড়ি ও আসাম পর্যন্ত যাতায়াত করত।
- ঐতিহাসিক ‘দার্জিলিং মেইল’: ব্রিটিশ আমল ও প্রাক-স্বাধীনতা যুগে কলকাতা থেকে শিলিগুড়ি ও পাহাড়ি পর্যটন কেন্দ্র দার্জিলিং যাতায়াতের জন্য জনপ্রিয় ও বিলাসবহুল ট্রেন ‘দার্জিলিং মেইল’ এই চিলাহাটি-হলদিবাড়ি রুট দিয়েই নিয়মিত চলাচল করত। সে যুগে ভারত ও বাংলার উত্তর অংশের মধ্যে যাত্রীবাহী ও পণ্য পরিবহনের প্রধান মাধ্যম ছিল এই রুট।
২. দেশভাগ ও পাকিস্তান আমল: বিচ্ছিন্নতার শুরু (১৯৪৭ - ১৯৬৫)
- দেশভাগ (১৯৪৭): ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের সময় চিলাহাটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) অন্তর্ভুক্ত হয়, আর এর ঠিক পরের স্টেশন ‘হলদিবাড়ি’ পড়ে ভারতে। সীমান্ত বিভক্ত হলেও কিছুদিন এই রুট দিয়ে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল অব্যাহত ছিল।
- সম্পূর্ণ বন্ধ হওয়া (১৯৬৫): ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর বৈরী রাজনৈতিক সম্পর্কের কারণে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি মধ্যকার রেল যোগাযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে ঐতিহাসিক দার্জিলিং মেইলসহ এই রুটের সমস্ত আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় এবং চিলাহাটি স্টেশনটি একটি প্রান্তিক বা টার্মিনাস স্টেশনে পরিণত হয়।
৩. স্বাধীন বাংলাদেশ ও দীর্ঘ অবহেলা (১৯৭১ - ২০১০)
স্বাধীনতার পর দীর্ঘদিন চিলাহাটি স্টেশন ও এর সংলগ্ন রেললাইনগুলোর যথাযথ আধুনিকায়ন হয়নি। এটি কেবল একটি সাধারণ অভ্যন্তরীণ লোকাল ও মেইল ট্রেন চলাচলের স্টেশনে সীমাবদ্ধ ছিল। এ অঞ্চলের মানুষের রাজধানী ঢাকার সাথে সরাসরি কোনো দ্রুতগতির বা আন্তঃনগর ট্রেন যোগাযোগ না থাকায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হতো।
৪. আধুনিকায়নের প্রথম ধাপ (২০১০ - ২০১৯)
- নতুন আন্তঃনগর ট্রেন: ২০১০ সালে সরকারের পক্ষ থেকে চিলাহাটি-ঢাকা রুটে সরাসরি আধুনিক আন্তঃনগর ট্রেন ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য প্রায় ১০৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সৈয়দপুর থেকে চিলাহাটি পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন সংস্কার ও পুনর্নির্মাণের কাজ হাতে নেওয়া হয়।
- এর ফলে উত্তরাঞ্চলের সাথে রাজধানীর রেল যোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয় এবং পরবর্তীতে আরও কিছু আন্তঃনগর ট্রেন (যেমন— চিলাহাটি এক্সপ্রেস, রূপসা, বরেন্দ্র ইত্যাদি) এই রুটে যুক্ত হয়।
৫. ৫৫ বছর পর ঐতিহাসিক পুনর্সংযোগ (২০২০ - ২০২২)
- রেলপথ পুনঃচালু (২০২০): দীর্ঘ ৫৫ বছর বন্ধ থাকার পর ২০২০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি ক্রস-বর্ডার রেলপথের উদ্বোধন করা হয়। প্রথমে এই রুট দিয়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল শুরু হয়, যা দুই দেশের বাণিজ্যে নতুন গতি আনে।
- মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন চালুকরণ (২০২২): ২০২২ সালের ১ জুন থেকে এই রুট দিয়ে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি পর্যন্ত আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেন ‘মিতালী এক্সপ্রেস’ চলাচল শুরু করে। এর মাধ্যমে চিলাহাটি সীমান্ত স্টেশনটি পুনরায় তার হারানো আন্তর্জাতিক গৌরব ফিরে পায়।
৬. বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বর্তমানে চিলাহাটি রেলওয়ে স্টেশনকে একটি আধুনিক আইকনিক স্টেশন হিসেবে রূপান্তর করার কাজ চলছে। এখানে কাস্টমস ও ইমিগ্রেশন সুবিধাসহ নতুন আধুনিক ভবন, ব্রডগেজ লাইন সম্প্রসারণ এবং পণ্য খালাসের জন্য ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়িত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলের অবহেলিত একটি সীমান্ত স্টেশন আজ বর্তমান সরকারের বহুমুখী পদক্ষেপে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন এবং জনসম্পর্কের অন্যতম প্রধান করিডোরে রূপ নিয়েছে।